Family Law • Oct 06, 2026 • By Ukilpara

বাংলাদেশে তালাকের নিয়ম ও প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ গাইড

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে তালাক দিতে হলে নোটিশ, ৯০ দিনের অপেক্ষা ও নিবন্ধনসহ কয়েকটি ধাপ মানতে হয়। স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের অধিকার ও করণীয় সহজ ভাষায় জেনে নিন।

বিবাহবিচ্ছেদ একটি কঠিন সিদ্ধান্ত, আর আইনি নিয়ম না মানলে পরে জটিলতা আরও বাড়ে। বাংলাদেশে মুসলিম দম্পতির তালাক মূলত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। মুখে তিনবার "তালাক" বললেই আইনগতভাবে তালাক কার্যকর হয় না; নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

স্বামী কীভাবে তালাক দেবেন

  1. লিখিত নোটিশ: তালাক ঘোষণার পর যত দ্রুত সম্ভব স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন সেই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে লিখিত নোটিশ পাঠাতে হবে।
  2. স্ত্রীকে অনুলিপি: একই নোটিশের একটি কপি স্ত্রীকে পাঠাতে হবে। রেজিস্ট্রি ডাকযোগে (প্রাপ্তিস্বীকারসহ) পাঠানো নিরাপদ, কারণ এতে প্রমাণ থাকে।
  3. সালিশি পরিষদ: নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান দুই পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠন করে সমঝোতার চেষ্টা করবেন।
  4. ৯০ দিন অপেক্ষা: চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে ৯০ দিন পার না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় না। এই সময়ের মধ্যে সমঝোতা হলে বা নোটিশ প্রত্যাহার করলে তালাক বাতিল হয়ে যায়।

স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা থাকলে ৯০ দিন অথবা সন্তান প্রসব, যেটি পরে ঘটে, তার আগে তালাক কার্যকর হবে না।

নোটিশ না দিলে কী হয়

চেয়ারম্যানকে নোটিশ না দেওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী এর শাস্তি এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয় দণ্ড।

স্ত্রী কীভাবে তালাক দিতে পারেন

  • তালাক-ই-তৌফিজ (অর্পিত ক্ষমতা): কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করে থাকলে স্ত্রী নিজেই একই নোটিশ প্রক্রিয়ায় তালাক দিতে পারেন।
  • খুলা: স্ত্রীর প্রস্তাবে এবং স্বামীর সম্মতিতে বিচ্ছেদ, সাধারণত স্ত্রী কিছু আর্থিক দাবি ছেড়ে দেন।
  • মুবারাত: দুজনের পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদ।
  • আদালতের মাধ্যমে: কাবিননামায় ক্ষমতা না থাকলে এবং স্বামী রাজি না হলে স্ত্রী মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ অনুযায়ী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। স্বামী চার বছর নিখোঁজ থাকা, দুই বছর ভরণপোষণ না দেওয়া, সাত বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড, নিষ্ঠুর আচরণ ইত্যাদি এর স্বীকৃত কারণ।

তালাক নিবন্ধন

তালাক কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) কাছে তালাক নিবন্ধন করিয়ে সনদ সংগ্রহ করুন। ভবিষ্যতে পুনর্বিবাহ, পাসপোর্ট, ভিসা বা সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজে এই সনদ প্রয়োজন হয়।

দেনমোহর ও ভরণপোষণ

  • তালাক যে পক্ষই দিক, স্ত্রী তাঁর অপরিশোধিত দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী (খুলার ক্ষেত্রে শর্ত অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে)।
  • ইদ্দতকালীন সময়ের ভরণপোষণ স্বামীকে দিতে হয়।
  • সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার, সন্তান যার হেফাজতেই থাকুক।
  • এসব আদায়ে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন।

অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে

খ্রিস্টানদের বিবাহবিচ্ছেদ ডিভোর্স অ্যাক্ট, ১৮৬৯ অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে হয়। প্রচলিত হিন্দু আইনে বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের সরাসরি বিধান নেই, তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্ত্রী পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন। বিশেষ বিবাহ আইনে বিবাহিতদের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য।

যা মনে রাখবেন

  • নোটিশের কপি, ডাক রসিদ ও প্রাপ্তিস্বীকারপত্র সংরক্ষণ করুন।
  • ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে পুনর্বিবাহ করবেন না।
  • কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে কী লেখা আছে তা আগে দেখে নিন।

এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, এটি আইনি পরামর্শ নয়। আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন। Ukilpara.com-এ আপনি পারিবারিক আইনে অভিজ্ঞ আইনজীবী খুঁজে নিতে পারেন।